করোনা ভাইরাস ও মুসলিমদের করণীয়

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মার্চ ২৪, ২০২০
করোনা ভাইরাস ও মুসলিমদের করণীয়

হাবিবুর রহমান:

وَلَنُذِيقَنَّهُم مِّنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَىٰ دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ

আর আমি তাদেরকে বড় শাস্তির আগে ছোট শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাই, যেন তারা ফিরে আসে। [সুরা সাজদা : ২১]

এ আয়াতের আলোকে প্রতিভাত হয়, করোনাভাইরাস-জাতীয় আজাবসমূহ পারলৌকিক আজাবের তুলনায় নিতান্তই ক্ষুদ্র। আল্লাহ তাআলা এজাতীয় আজাবের স্বাদ আস্বাদন করান, যেন বান্দারা তার উদ্দেশে ফিরে আসে। যেহেতু এজাতীয় শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্য হলো বান্দাদের আল্লাহর উদ্দেশে প্রত্যাবর্তন, তাই বান্দারা যদি প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তাদের থেকে শাস্তি উঠিয়ে নেবেন। কারণ, কার্য সমাধা হলে ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হলে শাস্তি বহাল না-থাকার বিষয়টিই আয়াতের ইঙ্গিতার্থের আলোকে প্রতিভাত হয়। ‘ফিরে আসা’ বাংলা শব্দ। এর আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘তাওবা’ বা ‘রুজু’।

উপরিউক্ত আয়াত ছাড়াও কুরআনের একাধিক আয়াতে শাস্তি প্রেরণের লক্ষ্য হিসেবে ‘রুজু’র কথা উল্লেখিত হয়েছে।

অন্যত্র আল্লাহ এ-ও জানিয়েছেন যে : وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ

আর তারা ক্ষমাপ্রার্থনারত থাকলে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন না। [সুরা আনফাল : ৩৩]

বান্দারা আল্লাহর দিকে রুজু করবে কীভাবে? কিসের থেকে রুজু ও তাওবা করলে বান্দা আল্লাহর উদ্দেশে ফিরে এসেছে বলে প্রতিভাত হবে? আজকাল খুব জোরেশোরে তাওবার কথা, রুজুর কথা, ক্ষমাপ্রার্থনার কথা উচ্চারিত হচ্ছে। ব্যক্তিগত তাওবার পাশাপাশি জাতিগত তাওবার কথাও অনেকেই বলছে। কিন্তু কিসের থেকে তাওবা করবে, এ বিষয়টি উল্লেখ করতে গেলে প্রায় সবাইই মূল পয়েন্ট বাদ দিয়ে শাখাগত পয়েন্টের ওপর ফোকাস করছে।

প্রথম কথা হলো, ‘জাতিগত তাওবা’ দ্বারা বাঙালি জাতির তাওবা উদ্দেশ্য নয়; বরং মুসলিম জাতির তাওবা উদ্দেশ্য। সুতরাং মুসলিম জাতি তাওবা করবে এমন কিছু থেকে, যাতে তারা নির্বিশেষে সকলেই লিপ্ত।

দ্বিতীয় কথা হলো, তাওবার প্রাথমিক ধাপসমূহ হলো রিদ্দাহ থেকে তাওবা করা। শিরক থেকে তাওবা করা। নিফাক (ইলহাদ ও জানদাকা) থেকে তাওবা করা। আকিদা ও আমলের বিদআত থেকে তাওবা করা। ফরজ ত্যাগ বা হারামে লিপ্ত হওয়া তথা কবিরা গোনাহ থেকে তাওবা করা; এক্ষেত্রে বিশেষভাবে যেসব কবিরা গোনাহের ব্যাপারে আয়াতে বা হাদিসে আজাব আসার কথা বিবৃত হয়েছে, সেগুলো থেকে তাওবা করা। এরপর অন্যান্য সর্বপ্রকার গোনাহ ও গাফলত থেকে তাওবা করা।

কেউ যদি রিদ্দাহ (পরিপূর্ণ বা আংশিক ইসলাম ত্যাগ), শিরকে আকবার, (এমন শিরক, যার কারণে মানুষ ইসলামের চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে যায়) নিফাক (ইসলামের শাশ্বত ও সর্বজনবিদিত কোনো বিধানের অপব্যাখ্যা) বা বিদআতে মুকাফফিরায় (এমন বিদআত, যা মানুষকে কাফির বানিয়ে দেয়) লিপ্ত থাকে, তাহলে সে যতই সাধারণ কবিরা ও সগিরা গোনাহ থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা করুক না কেন; সে একজন রুজুকারী বা তাওবাকারী হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না।

মুসলিম জাতি আজ যেসকল জাতীয় পাপে লিপ্ত আছে তন্মধ্যে শীর্ষ হলো, আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাহ (বিশেষত সার্বভৌমত্ব ও বিধান প্রণয়নের অধিকার) এবং তাঁর উলুহিয়্যাহ (জীবনের সবক্ষেত্রে তাঁর বিধানের সামনে আত্মসমর্পণ) এর ক্ষেত্রে শিরক। তাও আবার সাধারণ মানুষদের ক্ষেত্রে তো কেবল রয়েছে শিরকের গোনাহ; পক্ষান্তরে জ্ঞানীদের ক্ষেত্রে তো এর পাশাপাশি রয়েছে এসব সত্য আড়াল করার গোনাহও। নবুওয়াতের ক্ষেত্রে শিরকও এই যুগে উল্লেখযোগ্য হারেই চোখে পড়ে। এছাড়াও চারিদিকে চলে ইসলামের মাজলুম ফরজ বিধানের অপব্যাখ্যা, যা নিফাকের অন্তর্ভুক্ত। রয়েছে আরও অনেক তাহরিফ (অপব্যাখ্যা) ও কিতমান (গোপন করা)।

রাসুলুল্লাহ সা.-এর পবিত্র ‘লাশ’ কবরে রাখার আগে সাহাবিরা যে কর্ম সম্পাদন করেছেন, তা আজ প্রায় শত বছর ধরে উপেক্ষিত ও অবহেলিত। সর্বোচ্চ তিন দিন পর্যন্ত আমির নিযুক্তিতে বিলম্ব করার অবকাশ দেওয়া হলেও এক শতাব্দীকাল ধরে উম্মাহর আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ (কেন্দ্রীয় বিশেষ ব্যক্তিবর্গ) এই ফরজ তরক করে আছে। ফরজে আইন ও ফরজে কিফায়া উভয় প্রকার কিতালের জানাযা পড়ে ফেলেছে। তাদের হাত ধরেই ইসলাম ও কুফরি তন্ত্রমন্ত্রের সংমিশ্রণে নব্য দীনে ইলাহির গোড়াপত্তন হয়েছে।

তথাপি আজকালকার কথিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষজন, বিশেষ করে শিক্ষিতা মেয়েদের মতাদর্শ ও অভিমত যাচাই করলে দেখা যায়, তাদের প্রায় সবাইই ইসলামের কোনো না কোনো ক্ষেত্রে রিদ্দাহয় লিপ্ত। ফেমিনিস্ট, ডেমোক্রেটিক, ন্যাশনালিস্ট, ক্যাপিটালিজমের ধ্বজাধারী বা সেক্যুলার সুশীলদের কথা আলাদা করে না হয় নাই বললাম। এছাড়াও রয়েছে বিদআতে মুকাফফিরার ছড়াছড়ি সর্বত্র। তথাপি সকলের ওপর রয়েছে স্বজাতির মাজলুম জনগোষ্ঠী, বিশেষত ধর্ষিতা ও বন্দি নারীদের বদদুয়া, রয়েছে হকপন্থী মাজলুম আলিম দাঈ ও মুজাহিদদের কলজেছেঁড়া বেদনা। এমতাবস্থায় এসব মূল পয়েন্ট ছেড়ে শাখাগত বিষয়াদি থেকে তাওবা করলেই কি আমরা আজাব থেকে মুক্তি পেয়ে যাব?

বাস্তবতা তো হলো, আমরা আমাদের কৃতকর্মের কারণে শুধু করোনাভাইরাস বা পঙ্গপালই নয়; এরচে অনেক বড় আজাবের উপযুক্ত। রাসুলুল্লাহ সা.-এর দুয়া না থাকলে আমাদের পুরো জাতির ওপরই হয়তো আরও বহু আগেই নেমে আসতে মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ধ্বংসের ফায়সালা। নব্য জাহিলিয়াতের ভেতর শতাব্দীকাল ধরে আমাদের বসবাস; যা অনেক ক্ষেত্রে মধ্যযুগের জাহিলিয়াতকেও হার মানায়। এখনো নেই কোনো সচেতনতা। নেই অবস্থা পরিবর্তনের যথাযোগ্য কোনো উদ্যোগ।

অথচ আল্লাহ জানিয়েছিলেন :

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ ۗ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ ۚ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَالٍ ‘

নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যাবৎ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অকল্যাণ চাইলে কেউ তা রোধ করতে পারে না। আর আল্লাহ ছাড়া তাদের কোনো কর্মবিধায়কও নেই।’ [সুরা রাদ : ১১]

মুমিন এক গর্তে দুবার দংশিত হয় না। কিন্তু আমরা এক গর্তে শতসহস্রবার দংশিত হই। এরপরও আমাদের ঘুম ভাঙে না। এক শতাব্দীর ব্যর্থতার গ্লানি মুছে, প্রকৃত মুমিনদের সফলতার আখ্যান ভুলে এখনো আমরা পড়ে আছি পশ্চিমাদের দেখানো পথে।

সূরা নিসা আয়াত ৪০

إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ ۖ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا وَيُؤْتِ مِنْ لَدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا ইন্নাল্লা-হা লা-ইয়াজলিমুমিছকা-লা যাররাতিওঁ ওয়া ইন তাকুহাছানাতাইঁ ইউদাইফহা-ওয়াইউ’তি মিল্লাদুনহু আজরান ‘আজীমা।

নিশ্চয়ই আল্লাহ কারো প্রাপ্য হক বিন্দু-বিসর্গও রাখেন না; আর যদি তা সৎকর্ম হয়, তবে তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে বিপুল সওয়াব দান করেন। অতএব আল্লাহ আমাদের কৃতকর্মের যে প্রাপ্য দিচ্ছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নাই।

সূরা আর-রাদ আয়াত ১২

هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنْشِئُ السَّحَابَ الثِّقَالَ

হুওয়াল্লাযী ইউরীকুমুল বারকাখাওফাওঁ ওয়াতআমাওঁ ওয়া ইউনশিউছছাহা-বাছছিক ল। তিনিই তোমাদেরকে বিদ্যুৎ দেখান ভয়ের জন্যে এবং আশার জন্যে এবং উক্ষিত করেন ঘন মেঘমালা। এ আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হয়যে এমন মহামারী বিপদ গুলো আসে মূলত আমাদের ভয় দেখাতে,তাওবার মাধ্যমে গুনাহ মাফ করে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে।

সূরা নিসা আয়াত ৭৮

أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكْكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ ۗ وَإِنْ تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هَٰذِهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ ۖ وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هَٰذِهِ مِنْ عِنْدِكَ ۚ قُلْ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ ۖ فَمَالِ هَٰؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا আইনা মা-তাকূনূইউদরিককুমুল মাওতুওয়ালাও কুনতুম ফী বুরূজিম মুশাইইয়াদাতিওঁ ওয়া ইন তুসিবহুম হাছানাতুইঁ ইয়াকূলূহা-যিহী মিন ‘ইনদিল্লা-হি ওয়া ইন তুসিবহুম ছাইয়িআতুই ইয়াকূলূহা-যিহী মিন ‘ইনদিকা কুল কুল্লুম মিন ‘ইনদিল্লা-হি ফামালি হাউলাইল কাওমি লা-ইয়াকা-দূ না ইয়াফকাহূনা হাদীছা-।

তোমরা যেখানেই থাক না কেন; মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দূর্গের ভেতরেও অবস্থান কর, তবুও। বস্তুতঃ তাদের কোন কল্যাণ সাধিত হলে তারা বলে যে, এটা সাধিত হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যদি তাদের কোন অকল্যাণ হয়, তবে বলে, এটা হয়েছে তোমার পক্ষ থেকে, বলে দাও, এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। পক্ষান্তরে তাদের পরিণতি কি হবে, যারা কখনও কোন কথা বুঝতে চেষ্টা করে না। এ থেকে স্পষ্ট হ আমাদের পালানাোর কোন জায়গা া নেই,বরং আমাদের স্রষ্টার নিকট যেতেই হবে।তাই আমাদের তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস রাখা রচিত!

সূরা আল-ইমরান আয়াত ১৩৯ وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ওয়ালা-তাহিনূওয়ালা-তাহঝানূওয়া আনতুমুল আ‘লাওনা ইন কুনতুম মু’মিনীন। আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে। এ আয়াত দ্বারা মুমিনদের হতাশ না হওয়ার কথা বলা হয়েছে কারণ মুমিনের কোন হতাশা নেই সে মুমিন হলেই বিজয়ী। এক হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাঃ বলেন মৃত্যু মুমিনের জন্য উপহার স্বরূপ। অতএব মিমিন মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকবে কখনো মৃত্যু নিয়ে হতাশ হবে না!

 

লেখক:-

মুহা. হাবিবুর রহমান

তরুন লেখক ও ইসলামী  ব্যক্তিত্ব

Sharing is caring!