করোনাভাইরাস: সর্বশেষ সৌদি আরবের অবস্থা.!

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মার্চ ১৫, ২০২০
করোনাভাইরাস: সর্বশেষ সৌদি আরবের অবস্থা.!

মুহাম্মাদ তৈয়ব উল্লাহ

বিশেষ প্রতিনিধি, ওয়াদি আল দাওয়াসের, সৌদি আরব:

গেল বছর ডিসেম্বরের ৮ তারিখে চীনের উহান শহরে সর্বপ্রথম নভেল করোনা ভাইরাস covid 19 শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১১০ টি দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে এই ভাইরাস মহামারির আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন দেশে এত দ্রুত ছড়াচ্ছে এই ভাইরাস যে, তারা আক্রান্ত রোগীদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

মার্চের শুরুর দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যেও আঘাত হেনেছে এই ভাইরাস। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরানের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। এপর্যন্ত ইরানে ১২৭২৯ আক্রান্ত হয়েছে এই ভাইরাসে। তার মধ্যে ৬১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যার দিক থেকে ইরানের অবস্থান সারা বিশ্বে তিন নম্বর। চীন ও ইটালিই ইরানের উপরে অবস্থান করছে। ইরান থেকে খুব দ্রুতই এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতে। সৌদি আরবের আলকাতিফ শহর শিয়া অধ্যুষিত এলাকা। এখানকার নাগরিকরা সাধারণত বাহরাইন হয়ে ইরান সফর করে। আলকাতিফের এমনই এক সৌদি নাগরিক ইরান সফর করে বাহরাইন হয়ে সৌদি আরব প্রবেশ করার সময় চেকপয়েন্টে সে ইরান সফরের তথ্য ইচ্ছা করে গোপন রাখে।

প্রসঙ্গত সৌদি নাগরিকদের বাহরাইন সফর করতে কোনো পাসপোর্ট ভিসার প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র নিজেদের আইডিকার্ড দেখিয়ে সীমান্ত পাড়ি দেয়া যায়। ইরানের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক ভাল নেই, তাই ইরান ইচ্ছা করেই সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে বিভিন্ন বিবাদে জড়িয়ে থাকে। সৌদি আরবের অভিযোগ, তাদের দেশের শিয়া নাগরিকদের ইরান সফরের সময় ইরান কর্তৃপক্ষ পাসপোর্টে সিলমোহর লাগায় না। যাতে করে সৌদি কর্তৃপক্ষ বুঝতে না পারে এই লোক ইরান ভ্রমণ করেছে! এভাবেই ঐ সৌদি নাগরিককে সর্বপ্রথম চেকপোস্টে করোনা আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করা যায় নি। পরে বিভিন্ন অসুস্থতার আলামতে সন্দেহ হলে পরীক্ষায় সে প্রথম করোনা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়।

গতকাল ১৪ই মার্চ সৌদি আরব স্থানীয় সময় ৭:৪ সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী সৌদি আরবে নভেল করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১০৩ জন। ১২ জন রিয়াদে, বাকিরা আলকাতিফ, মক্কা সহ বিভিন্ন শহরে। আক্রান্তদের সবাই প্রাপ্তবয়স্ক গড় বয়স ৪৯ বছর, একমাত্র দুজন আক্রান্ত শিশু বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের ৩৫ জন সৌদি নাগরিক। বাকিরা বিভিন্ন দেশের বলে জানা গেছে। (এর মধ্যে মিশর ৪৮, বাহরাইন ২, যুক্তরাষ্ট্র ১, লেবানন ১, ফ্রান্স ১ বাংলাদেশ ১ নিশ্চিত হওয়া গেছে।) দুইজন ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে। বাকিরা এখনো।চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে।

সৌদি সরকার করোনার বিস্তার ঠেকাতে শুরু থেকেই বিভিন্ন সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। একদম গোড়ার দিকে যখন প্রথম করোনা ভাইরাস রোগী শনাক্ত করা হয়, তখন থেকে ববহির্বিশ্ব ও সৌদি নাগরিক সকল পূণ্যার্থীদের জন্য ওমরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর পর কাবা শরীফের তাওয়াফ সংকুচিত করে দেয়া হয়। মাত্বাফে তাওয়াফ বন্ধ রেখে অন্যান্য ফ্লোরে তাওয়াফ চালু রাখা হয়। যদিও একদিন পরই কাবার চারপাশ ঘিরে রেখে মাতাফ তাওয়াফের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হয়। পবিত্র মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী এশার নামাজের এক ঘন্টা পর বন্ধ করে ফজরের একঘন্টা পূর্বে খুলে দেয়া,(ইতিপূর্বে চব্বিশ ঘন্টা খোলা থাকতো) জমজমের পানি পান করানোর ব্যবস্থা রহিতকরণ, রাসূল সা. এর রওজা, জান্নাতুল বাকী বন্ধ রাখা, সকল ওয়াক্তে আযানের দশ মিনিটের মধ্যে নামাজ শুরু করে দেয়া, জুমার নামাজ ও খুতবা সব মিলে পনেরো মিনিটের মধ্যে শেষ করা, মসজিদের ইফতার আয়োজন না করা, ই’তেকাফ না করা ইত্যাদি বিভিন্ন ডিক্রি জারী করা হয়।

গত ৭ই মার্চ রাতে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষপ্রতিষ্ঠান পরবর্তি আদেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ইতিমধ্যে মিডিয়ার মাধ্যমে জনসাধারণকে বাহিরে বের হওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। মোবাইল এসএমএস সহ বিভিন্ন মাধ্যমে স্যানিটাইজার দিয়ে বার বার হাত ধোয়া, প্রয়োজনে বাইরে বেরুতে মাস্ক ব্যাবহার করা, মুখে সালাম দিয়ে হ্যান্ডশেক না করা ইত্যাদি নির্দেশনা প্রচার করা হচ্ছে। যেকোনো প্রয়োজনে ৯৩৭ হেল্পলাইনের সাহায্য নিতে বলা হয়েছে।

সারাবিশ্বের ন্যয় এই ভাইরাসের প্রভাবে সৌদি অর্থনীতিতেও বড় রকমের প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে মক্কা মদীনার ব্যবসায়ী, যাদের ব্যবসা হজ্জ ও ওমরা জিয়ারতকারীদের উপর নির্ভরশীল তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ ভাইরাসের প্রভাবে। প্রবাসী বাংলাদেশী যাদের কাজকর্ম ও ব্যবসা বাণিজ্য স্কুল কলেজ নির্ভর, তারাও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত এই ভাইরাসের প্রভাবে।

আগামীকাল ১৫ই মার্চ সকাল এগারোটা থেকে ১৫ দিনের জন্য সকল আন্তার্জাতিক ফ্লাইট আসা যাওয়া বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই পনেরো দিন যারা আটকা পড়বে তাদের জন্য এবং যারা সদ্য অন্য দেশ থেকে আগত, তাদের জন্য ছুটি হিসেবে বিবেচিত হবে। সদ্য আগতদের ১৫ দিন সেল্ফ কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য বলা হয়েছে। এবং যারা নির্দেশনা অমান্য করবে তাদের শাস্তির মুখোমুখি করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি এমন জটিল যে, এ ভাইরাসের প্রকোপ থেকে পরিত্রাণের জন্য সব রকমের সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে তাওবা ইস্তেগফারের মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনাই একমাত্র ভরসা হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা এতো গবেষণা ও চেষ্টা করে এখনো এই ভাইরাসের কোনো ভ্যাকসিন আবিস্কার করতে পারছে না।

Sharing is caring!