কওমী শিক্ষার্থীদের প্রতি খোলা চিঠি

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ২৯, ২০২০
কওমী শিক্ষার্থীদের প্রতি খোলা চিঠি
  • শেখ ফজলুল করীম মারুফ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক অদ্ভুত শিক্ষাব্যবস্থা। পুরো ব্যবস্থাটাই তত্ত্বীয়। প্রয়োগিক বা বৃত্তিমূলক না।

কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা আরো বেশি তত্ত্বীয়। এমনকি কওমী মাদ্রাসায় যে জ্ঞান শিক্ষা দেয়া হয় তার বৃত্তিমূলক ব্যবহারের ব্যাপারে ইসলামের মুলপাঠে নিষেধাজ্ঞা আছে এবং পরকালে “জান্নাতের ঘ্রাণও না পাওয়া” র হুমকি আছে। পরে অবশ্য ইসলামী আইন ও সমাজতাত্ত্বিকরা শর্তসাপেক্ষে এই জ্ঞানের বৃত্তিমূলক ব্যবহারকে বৈধতা দিয়েছেন।

কওমী মাদ্রাসায় প্রাপ্ত তত্ত্বীয় জ্ঞানের বৃত্তিমূলক ব্যবহারের ক্ষেত্র একেবারেই সংকীর্ণ। সীমিত পর্যায়ে ধর্মীয় আচার পরিচালনা করা ও প্রাপ্ত জ্ঞানের পুনঃচর্চা করা ছাড়া এর আর কোন ক্ষেত্র নাই।

বাংলাদেশে এই দুই ধরনের কাজের উপযোগ এখন নাই বললেই চলে। যতটুকু প্রয়োজন ছিলো তা পুর্ন হয়েছে বেশ আগেই। বাংলাদেশের কোথায় আর নতুন করে মসজিদ নির্মানের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না। এবং কোন মসজিদেই নতুন জনশক্তি নিয়োগের প্রয়োজন নাই। কিছু রদবদল হয় কিন্তু সেটা একেবারেই নগন্য। তার মানে সীমিত পরিসরে ধর্মীয় আচার পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন কোন জনশক্তির দরকার নাই।

জ্ঞানের পুনঃউৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন অবশ্য এখনো আছে তবে তা গ্রাম-গঞ্জে। শহরেও আছে যদি তার উপযোগ সৃষ্টি করা যায়।

এর অর্থ হলো, কওমী শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসছে। এমত পরিস্থিতিতে কওমী শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের বিকল্প খোজা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

কিন্তু বিকল্প খোজাটা সহজ ছিলো না, এখনও সহজ নাই। প্রথমত এখনো পুনরায় জ্ঞান চর্চার কাজে নিযুক্ত না হওয়াকে “দ্বীনের খেদমত থেকে সরে যাওয়া” বিবেচনা করা হয়। দ্বিতীয়ত বিকল্প কিছু করার মতো জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পুঁজির অভাব।

এখন এই করোনাকাল আমাদেরকে বিকল্প পথে যেতে বাধ্য করেছে। করোনার যে পরিস্থিতি ও মাদ্রাসার ক্ষেত্রে সরকারের যে বিমাতাসূলভ আচরন তাতে কওমী মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট লাখ লাখ মানুষ উপার্জনহীন হয়ে পড়েছেন বা হতে চলেছেন। এমতাবস্থায় বসে বসে হাহুতাশ করা বা উলামায়ে কেরামের জন্য ত্রাণ গ্রহণ করা কোন সন্মানজনক পন্থা না। এরচেয়ে বিকল্প কোন রাস্তায় উপার্জনের ব্যবস্থা করা উত্তম এবং সন্মানজনক পন্থা।

প্রশ্ন হলো, কি করবো? আমি বলবো, যেকোন কিছু। আপনি আপনার পরিচিতজনদের সাথে কথা বলুন। আলোচনা করুন। এবং কিছু করার সিদ্ধান্ত নিন। পথ বেড়িয়ে যাবে।

যেকোন ধরনের পণ্য বা সেবা তৈরি করতে পারেন বা বিক্রি করতে পারেন। আবারো বলছি, যেকোন ধরনের। কেবল একটু নতুনত্ব আনতে হবে।

ইসলামের নবীরা ও আকাবিরগন সব ধরনের কাজই করেছেন। জুতো সেলাই বৈদেশিক বাণিজ্য। তাই কোন কাজকেই ছোট করে দেখার বা তুচ্ছ মনে করার কারণ নাই।

সন্মান? ইন্না আকরমাকুম ইনদাল্লাহি আতক্বকুম। আমাদের আকাবিরগনের সন্মানের ভিত্তি ছিলো, তাকওয়া, আত্মমর্যাদা ও অমুখাপেক্ষী মনোভাব।

তিনি কি করেন? কত টাকা উপার্জন করেন এগুলোকে মর্যাদার ভিত্তি বানিয়েছে বস্তুবাদীরা। ইসলামে মর্যাদার ভিত্তি ভিন্ন। এবং আদতেও মর্যাদার ভিত্তি হলো, তাকওয়া, আত্মমর্যাদা ও অমুখাপেক্ষী মনোভাব। এই কিছুদিন আগেও মাওলানা ভাসানী প্রবল সন্মান ও মর্যাদা নিয়ে রাজনীতি করেছেন। কিন্তু তিনি আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন না। আমরা আমাদের আকাবিরদের বহু ঘটনা জানি যেখানে জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থাতেও তারা খলিফা ও সুলতানদের কাছে ছিলেন সীমাহীন মর্যাদার অধিকারী। সেজন্য যা-কিছু হোক নিজে কিছু করুন।

এতে করে আপনি স্বাবলম্বী হবেন, আপনি গ্রহিতা থেকে দাতায় পরিনত হবেন। আপনার ও ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।

অতএব, কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নয়। বরং আজকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করুন। সম্ভবনা খুজে বের করুন এবং কাজে নেমে পড়ুন। আল্লাহ আমাদের সহায় হবেন।

Sharing is caring!