কওমী মাদ্রাসার দেশীয় ও ভিনদেশী শুরা নিয়ে কিছু কথা

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত জুলাই ১২, ২০২০
কওমী মাদ্রাসার দেশীয় ও ভিনদেশী শুরা নিয়ে কিছু কথা

আবদুস সালাম

কওমী মাদ্রাসা পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কমিটি হচ্ছে শুরা। তবে বর্তমান সময়ে এটি অত্যন্ত জটিল একটি বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশের শুরার দিকে নজর দিলে আমাদের দেশের শুরার ব্যাপারটা একটু ভিন্নধারারই মনে হয়। আমাদের দেশের শুরার মধ্যে আঞ্চলিকতার প্রভাবটা অত্যন্ত বেশী। যার কারণেই বর্তমান শুরার উপর খুবই সহজে চেপে বসে পড়ে উড়ে আসা অদৃশ্য শক্তি।

উদাহরণ সরূপ ধরুন উম্মুল মাদারিস খ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ। বিশ্বব্যাপী কওমী মাদ্রাসার রূপ মডেল। আমার দৃষ্টিতে একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সবকটি দেশেই বিশেষ করে দারুল উলুম দেওন্দের শুরা পদ্ধতিকে অনুসরণ করা হয়। তবে শুরার বিষয়টি আমাদের দেশে এসে ভিন্ন ধারায় পরিচালিত হয়েছে। দারুল উলুম দেওবন্দের শুরা পদ্ধতিকে অনুসরণ করে শুরা গঠন করলে হয়তো বাংলাদেশের শুরা পদ্ধতির প্রক্ষাপটই বদলে যেতো।

দারুল উলুম দেওবন্দ অবস্থিত ভারতের উত্তরপ্রদেশে। তবে এর শুরায় রয়েছেন গোটা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের শুরা সদস্য যেমনঃ- দেওবন্দ‚ পালনপুর‚ চেন্নাই‚ মুম্বাই‚ আসাম‚ হায়দ্রাবাদ‚ কেরেলা‚ লাখনৌ‚ গুজরাট‚ কাশ্মীর‚ রাজস্থান‚ ঝাড়খন্ড‚ নাদওয়া‚ মাদ্রাজ‚ কানপুর‚ মুজাফফরপুর‚ পশ্চিমবঙ্গ‚ পাটনা বিহার ও বিজনুর সহ অনেক অজানা প্রদেশ। বাস্তবেই এক অদ্ভুত‚ সুক্ষ্ম ও ভবিষ্যৎ অমঙ্গলশঙ্কী শুরা সিলেকশন। আর অদ্ভুত হবেইনা কেন বিশ্বের কওমী মাদ্রাসার মডেল বলে কথা।

এইবার আসুন পাকিস্তানের দারুল উলুম করাচী এটা পাকিস্তানের কওমী মাদ্রাসার মার্কাজ। এখানেও শুরা পদ্ধতিতে কিঞ্চিৎ পরিমাণ দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে ব্যাতিক্রম নয়। অত্র মারকাজেও সদস্য রয়েছেন:-
করাচি‚ মুলতান‚ ওকাড়া‚ জাঙ্গিরা‚ লাহোর‚ বেলুচিস্থান‚ হায়দ্রাবাদ ও পিশাওয়ার থেকে।

আসুন জামেয়া ফারুকীয়াতে এখানেও রয়েছেন দশজন শুরা দশটি ভিন্ন প্রদেশ থেকে। দেখুন বোর্ড জামেয়া খাইরুল মাদারিস‚ পাকিস্তানের বেফাক‚ এছাড়া জামেয়া ইমদাদিয়া আশরাফিয়া ও জামেয়া হক্কানিয়া সহ বড় বড় সবকটি মাদ্রাসাযর শুরাতে রয়েছেন একাধিক প্রদেশের শুরা সদস্য। দারুল উলুম দেওবন্দ সহ বিশ্বের সব যায়গায়ই শুরা সিলেকশন হয় একই কায়দায়। কিন্তু ব্যাতিক্রমধর্মী সিলেকশন শুধুই বাংলাদেশেই। উপর থেকে সাহেবজাদাদের প্রভাব বিস্থার যা আমাদের দেশের তুলনায় অন্যান্য দেশে অত্যন্ত নগণ্য সংখ্যক অথবা নাই বললেই চলে।

ভারত পাকিস্তান চাইলেও পারে অঞ্চল ভিত্তিক আঞ্চলিকতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আঞ্চলিকভাবে শুরায়ি নিজাম বা শুরা সদস্য রাখতে। কিন্তু তা তাঁরা করেন নাই। কারন‚ যেমন আমাদের দেশে শুরায়ি পদ্ধতিতে আঞ্চলিকতার ধারা বহাল থাকায় অদৃশ্য শক্তি প্রভাব ফেলতে পারে সহজে। কিন্তু আট বিভাগের আটজন শুরা সদস্য থাকলে হয়তো একই সঙ্গে আটজনের উপর অতি সহজে সেই অদৃশ্য শক্তি প্রভাব ফেলতে পারতোনা।

দ্বিতীয়তঃ সাহেবজাদা সমস্যা। সকল সাহেবজাদা যে একই রকমের তা কিন্তু নয়। এক দুজন সাহেবজাদার জন্য যে সবাইকে একই পাল্লায় ওজন করা যাবে তা মোটেও নয়। যেমন ভারতের হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানতুভী রহ:‚ শাইখুল আরব হুসাইন আহমদ মাদানী রহ:‚ আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি রহ:‚ আল্লামা মনজুর নোমানী রহ:‚ মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী রহ:‚ সাইয়্যেদ আতাউল্লাহ শাহ বুখারী রাহিমাহুল্লাহ প্রমুখ মনীষীদের সাহেবজাদারা ছিলেন পিতার নকশে কদমের এক এক মডেল। প্রায় সবারই সাহেবজাদা ছিলেন দারুল উলুমের সিনিয়র শিক্ষক কিংবা শুরা সদস্য কিংবা অন্য কোন দ্বায়িত্বশীল পদে।

পাকিস্তানের আল্লামা মুফতি শফী রহ:‚ মুফতি মাহমুদ রহ:‚ আল্লামা খায়ের মুহাম্মদ মক্কী রহ:‚ আল্লামা ইউসুফ বিন্নুরী রহ:‚ আল্লামা ইউসুফ লুদীয়ানভী রহ‚ আল্লামা গুলাম গউস হাজারভী রহ:‚ আল্লামা গুলামুল্লাহ খান রহ: ও ক্বারী হানিফ মুলতানি রাহিমাহুল্লাহ প্রমুখ মনীষীদের সাহেবজাদাদের প্রত্যেকেই ছিলেন পিতার অনুসরণীয় ছায়া সরূপ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এমন অনেক আছেন যারা পিতার যোগ্য সাহেবজাদা হতে পেরেছেন। যেমন সাহেবজাদা আল্লামা নুর উদ্দিন গহরপুরি রহ:‚ সাহেবজাদা শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ:‚ সাহেবজাদা মাওলানা ফজলুল হক পীর সাহেব চরমোনাই রহ:‚ সাহেবজাদা আল্লামা তফাজ্জল হক হবিগঞ্জি রহ:‚ আল্লামা নুর হুসাইন ক্বাসেমি দামাত বারাকাতুহুম সহ অগনীত আকাবীর।

সময়ের বদলে দেওবন্দের শুরায়ি নেজামের অনুসরণে বাংলাদেশের প্রক্ষাপটও বদল হুক এটাই কামনা করি। বদল হুক‚ নিষেধ আসুক পিতা-পুত্রের একই প্রতিষ্ঠানে খেদমতে না থাকার উপর। পরিবর্তন হুক আমৃত্যু মুহতামীমের ধারাবাহিকতা। বয়সের সিমাবদ্ধতা রেখে অবসরের নিয়ম চালু হুক। এতে করে স্ব-সম্মানে মুহতামীম সাহেব ও পরিচালক-মহাপরিচালক সাহেবরা মুল্যায়ন পাবেন। সাজেবজাদারা নিজের যোগ্যতা অর্জনে ব্যাস্ত থেকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পিতার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে দৌড়ঝাঁপ করবেন। এভাবে পুর্ববর্তী ও পরবর্তী সবাই পাবেন যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান‚ পাবেন যথাযথ মুল্যায়ন। শান্ত থাকবে প্রতিষ্ঠান‚ থাকবে আশংকা মুক্ত। ধারাবাহিকতায় বাস্তবায়িত হতে থাকবে কওমী মাদ্রাসার মুলনীতি ও আদর্শ। অক্ষুন্ন থাকবে কওমী মাদ্রাসার শান-মান ও মর্যাদা।

 

লেখক:- আবদুস সালাম

ইসলামিক লেখক, প্রবাসী বাংলাদেশী

Sharing is caring!