একজন বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গ

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত আগস্ট ১৫, ২০২০
একজন বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গ
  • মো: হাসিব উল্লাহ

লক্ষ কোটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই মহান নেতা ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, স্বাধীনতার স্থপতি, জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় প্রথম ভাষণ প্রদানকারী ব্যক্তি এবং ভাষা আন্দোলনে প্রথম কারাবন্দীদের মধ্যে অন্যতম। একটি তর্জনী, একটি বজ্রকণ্ঠের মাধ্যমে করেছিলেন যিনি বাঙালী জাতিকে ঐক্যবদ্ধ।

আন্দোলন করেছিলেন শোষিত বাঙালী জাতির পক্ষে এবং পাকিস্তানি যালিম শাসকদের বিরুদ্ধে। পেয়েছেন “হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী ও জাতির জনক” খেতাব। বাঙালী জাতিকে পাকিস্তানি দুঃশাসনের কবল থেকে মুক্ত করতে নিয়েছিলেন জীবনের যুঁকি, করেছেন সংগ্রাম। ফলে, জীবনের কিছু অংশ কাটিয়েছেন অন্ধকার কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে। তবুও পিছপা হননি স্বাধীনতা অর্জনের পথে এগিয়ে চলতে। জাতির মাঝে গড়ে তুলেছিলেন ঐক্য, সবাইকে বুঝিয়েছিলেন স্বাধীনতা অর্জন ছাড়া একটি রাষ্ট্র ও জাতি স্বাধীনভাবে চলতে পারে না এবং স্বাধীনতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এই মহান নেতা। দেশের জন্য, দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন আন্দোলনের প্লাটফর্ম। বিভিন্ন মিছিল, সমাবেশে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। রাজনৈতিক জীবনের নানারকম অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন “অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, আমার দেখা নয়াচীন” নামক প্রভৃতি গ্রন্থসমূহ। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে শুরু করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনসহ প্রতিটি স্তরে রেখেছেন অসামান্য অবদান।

ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের ক্ষেত্রে রেখেছেন বিশেষ অবদান। ১৯৭০সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ জয়ী হওয়ার পরেও পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে গভীর ষড়যন্ত্রের ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রিসভা গঠন করতে ব্যর্থ হন। পাশাপাশি বাঙালী জাতির প্রতি পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর নির্যাতনও আরো বেড়ে যায়।

ফলশ্রুতিতে, ১৯৭১সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থেকে চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা অর্জনের আহ্বান জানিয়ে দিয়েছিলেন এক ঐতিহাসিক ভাষণ। যে ভাষণের জন্য শুধু বাংলাদেশই নয়, বরং সমগ্রবিশ্বে হয়ে আছেন চির স্মরণীয়। তাঁহার এই ঐতিহাসিক ভাষণটি পেয়েছে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি।

১৯৭১সালের ২৬মার্চ থেকে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু, পাকিস্তান সরকার ২৫মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে অন্যায়ভাবে আটক করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায় এবং জেলে বন্ধি করে রাখে। বাংলার দামাল ছেলেরা প্রিয় নেতার আহবানে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে প্রায় ৩০লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলার স্বাধীনতা। বাঙালী জাতি তাদের প্রিয় নেতাকে উপহার দেয় “স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ” এবং বিশ্ব মানচিত্রে অঙ্কিত হয় লাল-সবুজের পতাকা।

১৯৭২সালে কারাবন্দী থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে গঠন করেন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভা। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে আধুনিক বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে গ্রহণ করেন বিভিন্ন উদ্যোগ। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালের ১৭সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে এবং ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়। ইসলামের অগ্রগতির জন্য প্রতিষ্ঠা করেন

“ইসলামীক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ” নামক এক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান।
কিন্তু, একদল বিপথগামী সেনা অফিসার ১৯৭৫সালের ১৫আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বাঙালি জাতির ইতিহাসে রচিত হয় এক কালো অধ্যায়। এই বিপ্লবী মহান নেতার আকস্মিক মৃত্যুতে স্তব্দ হয়ে যায় বাংলার সমস্ত জনগণ। বাঙালী জাতি শুধু একজন নেতাকেই হারায়নি, বরং হারিয়েছে তাঁদের প্রিয় অভিভাবককে। বিশ্বাসঘাতকেরা তাঁকে হত্যা করলেও মুছে ফেলতে পারেনি বাঙালী জাতির হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম। আজও কবি, সাহিত্যিকসহ বাংলার আপামর জনসাধারণ গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে এই প্রিয় মানুষটিকে এবং ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে একটি নাম বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখক:
মো: হাসিব উল্লাহ
শিক্ষার্থী,
দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামীক স্টাডিজ বিভাগ
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম

Sharing is caring!