ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নেতৃত্বের মেয়াদ সংক্রান্ত আলোচনার পরিধিভুক্ত না

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মে ১৭, ২০২০
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নেতৃত্বের মেয়াদ সংক্রান্ত আলোচনার পরিধিভুক্ত না

শেখ ফজলুল করীম মারুফ:
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ইসলামী সংগঠনের বিদ্যমান কোন সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। International Crisis Group এর Understanding to Islamism শীর্ষক গবেষণায় বিশ্বের ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে তার কোনটার মধ্যেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পড়ে না।

এর কারণ-ও সম্পুর্ন যৌক্তিক। সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্বে স্থানিক বিষয় মূখ্য। কোন সংজ্ঞা সার্বজনীন না। সেজন্যই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে বৈশ্বিক কোন সংজ্ঞায় পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে বুঝতে হলে Holistic Approach এ দেখতে হবে। যারা জানেন না তাদের বলে রাখা ভালো, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি  Group of Organisation এর অংশ। অনেকগুলো  Subsystem মিলে এই সংগঠনগুচ্ছ তৈরি করা।

বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের এই Holistic approach এর মুল চিন্তক ছিলেন সৈয়দ ফজলুল করীম রঃ।

তিনি ইসলামী বিপ্লব বলতে কেবল ইসলামের রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতায়নকে বুঝতেন না। তার কাছে ইসলামী বিপ্লবের এর অর্থ ছিলো, একটি জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা, চিন্তা কাঠামো, স্বভাব-চরিত্র, সংস্কৃতি সবকিছুই শরীয়াহর অনুগামী হয়ে যাওয়া। একই সাথে মানুষের এই আন্তরিক শরীয়াহ অনুগামীতাকে সহায়তা করার জন্য ও রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রীয় বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠা করা।

মানুষের চিন্তা, চিন্তা কাঠামো, জীবনবোধ, স্বভাব, চরিত্র ও সংস্কৃতিকে শরীয়াহ অনুগামী করার কাজ কেবল মাত্র রাজনৈতিক সংগঠন দ্বারা সম্ভব না। এরজন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক প্রচেষ্টা। তিনি সেই বহুমাত্রিক কাজ করার জন্য অনেকগুলো আপাততঃ স্বাধীন অনেকগুলো সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইসলামী বিপ্লবের যে সংজ্ঞা তিনি করতেন তা অর্জনের দিকে এই
Group of Organisation এগিয়ে যাচ্ছে।

এর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি। যারা (Apolitical) অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু রাজনীতি বিরুদ্ধ নয়। যাদের কাজ হলো, দেশের মসজিদগুলোকে কেন্দ্র করে মানুষের দ্বারে-দ্বারে গিয়ে ব্যক্তিগত দাওয়াত ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে মানুষকে দ্বীনের পথে আনা এবং দ্বীনের পথে মানুষের অটল-অবিচল থাকার জন্য সকলকে নিয়ে আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করা।  আরেকটি হলো বাংলাদেশ কোরআন শিক্ষা বোর্ড। এটাও (Apolitical). অরাজনৈতিক।  যাদের মুল দায়িত্ব হলো বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে অন্তত একটি করে মক্তব প্রতিষ্ঠা করা। যাতে করে বাংলাদেশে জন্ম নেয়া প্রতিটি মুসলিম সন্তানকে শিশুকালেই কোরআনের মৌলিক শিক্ষা দেয়া যায়।

আরেকটি হলো, চরমোনাই মাদ্রাসাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মুলধারার মাদ্রাসা তৈরি করা। যেসব মাদ্রাসায় ইসলামী জ্ঞানের তত্ত্বীয় শিক্ষার পাশাপাশি দেওবন্দের চেতনা ও অনুশীলন মোতাবেক প্রয়োগিক শিক্ষাও দেয়া হয়।

আরেকটি হলো, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। একটি রাজনৈতিক সংগঠন।

এই সংগঠনগুলো পরস্পর আইনত অনির্ভরশীল। কিন্তু দর্শনগতভাবে ঐক্যবদ্ধ।

শায়খ রঃ এই সংগঠনগুলোর আন্তঃসম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন,
বামুকের সবাই মুলত আত্মশুদ্ধির কাজেই নিমগ্ন থাকবে কিন্তু তাদের আত্মশুদ্ধির পূর্নতার জন্যই তাদেরকে রাজনৈতিক সংগঠন অংশগ্রহণ করতে হবে। আবার রাজনৈতিক সংগঠনের লোকেরা রাজনৈতিক কার্যক্রমই করবে কিন্তু তাদের রাজনৈতিক শুদ্ধতার জন্য তাদেরকে আত্মশুদ্ধির কাজে সক্রিয় থাকতে হবে। একই ভাবে কোরআন শিক্ষা বোর্ড ও জামেয়াগুলো শিক্ষা ও তালিমের কাজই করবে কিন্তু শিক্ষা ও তালিমের পূর্নতার জন্য আত্মশুদ্ধি ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকবে তেমনি বামুক ও আইএবির লোকেরাও দ্বীনের প্রসারে বাকুশি ও জামেয়াগুলোর সহায়তা করবে।

এই যে একটি সর্বব্যাপী কাজ এর একটি কেন্দ্র থাকা চাই। একটি পরম বিন্দু থাকা চাই। তা নাহলে সব এলোমেলো হয়ে যাবে এবং সমন্বয়হীন হয়ে যাবে।

পীর সাহেব চরমোনাই সেই কেন্দ্র বিন্দুর ভুমিকা পালন করেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ এই Group of organisation ভুক্ত সংগঠনগুলো নেতৃত্ব কাঠামো একটু অন্য রকম। পীর সাহেব চরমোনাই এই সংগঠনগুলোর মুল নেতা কিন্তু তিনি এর কোনটারই নির্বাহী প্রধান না।  তিনি এই সংগঠনগুলোর দৈনন্দিন কাজের নেতৃত্ব দেন না আবার কোন সংগঠনের কোন কাজই তার বিস্তৃত অনুমোদন ছাড়া হয় না।

তিনি সকল সংগঠনের ওপরে এবং এই সংগঠনভুক্ত সকল নেতা, কর্মী বা সমর্থকদের একটি আত্মিক বন্ধনে একত্রিত করে রেখেছেন। সর্বত্র একটি আত্মিক নিয়ন্ত্রণ ও চুড়ান্ত আইনি অনুমোদনের ক্ষমতা তিনি সংরক্ষণ করেন।

পীর সাহেব চরমোনাই আমাদের কেবলই রাজনৈতিক নেতা না বরং তিনি প্রধানত আমাদের তরিকতের শায়খ। আত্ম সংশোধনের উপায় হিসেবেই তার নির্দেশে আমরা রাজনীতি করি বা আরো অন্য কাজ করি। তার সাথে আমাদের সম্পর্ক ক্ষমতার না, দলীয় প্রধান আর কর্মীর সম্পর্ক না। তার সাথে সম্পর্ক নেতৃত্বের না।

বরং এই সম্পর্ক অনেক বেশি আত্মিক।  এই সম্পর্ক ভক্তি, স্নেহ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার।

তাই ইসলামপন্থী রাজনৈতিক নেতৃত্বের মেয়াদ সংক্রান্ত আলোচনা তাঁদের স্পর্শ করে না।

কারণ, নেতৃত্বের মেয়াদ সংক্রান্ত  আলোচনার মুল ভিত্তি হলো, “ক্ষমতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা” নীতিমালা। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ঐ আলোচনার মূখ্য বিষয় হলো, “ক্ষমতা” এর ধারনা।

কিন্তু পীর সাহেব চরমোনাই এর সাথে আমাদের সম্পর্কে “ক্ষমতা” বলে কোন ধারনার অস্তিত্ব নাই। তিনি “ক্ষমতা” ব্যবহার করে “পীর সাহেব চরমোনাই” হননি এবং “ক্ষমতা” ব্যবহার করেও তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন না। গোটা সংগঠন পরিচালনায় কোথাও তিনি “ক্ষমতা” প্রয়োগ করেন না এমনকি এই গ্রুপ অফ অর্গানাইজেশন পরিচালনায় “ক্ষমতা” এর ব্যবহার হয় না।

ফলে পীর সাহেব চরমোনাই ও এই সংগঠন নেতৃত্বের মেয়াদ সংক্রান্ত আলোচনার আওতাভুক্ত না।

যারা “ক্ষমতা”ই প্রয়োগ করে না তাদের জন্য আবার ” ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা” এর আলোচনা প্রাসঙ্গিক হয় কি করে?

আমার আগের আলোচনায় নেতৃত্বের মেয়াদ সংক্রান্ত যে আলোচনা করেছিলাম তাতে কেউ কেউ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চরিত্র সম্পর্কে না জেনে, না বুঝে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকেও সেই আলোচনার পরিধিভুক্ত করেছেন। তাদের জন্য এই আলোচনার করা হলো।

কেউ কেউ এই আলোচনা আমার সংগঠন কিভাবে নেবে সেটা নিয়েও শংকা প্রকাশ করেছেন।

তাদের উদ্যেশ্যে বলতে চাই, এই সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা আমি করেছি ২০১৭ সালে। এর পরে আমি দুই বার ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। ঐ আলোচনা আমার জন্য কাল হয়নি বরং আশির্বাদ হয়েছে আল হামদুলিল্লাহ।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এমনই। পীর সাহেব চরমোনাই এর মুল কারামত এটাই। তিনি ও তার সংগঠন চিন্তা, মুক্তচিন্তা ও প্রথাবিরুদ্ধ চিন্তাকে সর্বদাই উৎসাহিত করে। বরং কেউ গতানুগতিক হলেই বরং তার তিরস্কার শোনার সম্ভবনা তৈরি হয়। পীর সাহেব চরমোনাই ও তার সংগঠনের আরেকটি প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো, সবসময়ে সেরাটা গ্রহণ করা। সহিটা গ্রহণ করা। এদের বহুদিনের চর্চার মোকাবিলায় যদি কোন শুদ্ধতম বর্ণনা পাওয়া যায় বা উত্তম কোন পন্থা পাওয়া যায় তাহলে সেটা গ্রহণ করতে এই সংগঠনের বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় না।

তাই আবারো বলছি, নেতৃত্বের মেয়াদ সংক্রান্ত আলোচনায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রাসঙ্গিক না। কারণ তাদের সংগঠন পরিচালনার ধরন, চরিত্র আলাদা। তারা কোথাও ক্ষমতা চর্চা করে না। যারা ক্ষমতাই চর্চা করে না তাদের জন্য ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার আলোচনা প্রযোজ্য হয় না। এটা সাধারণ জ্ঞানের কথা।

এই বিষয়ে কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করতে চাইলে দয়া করে তাকে ক্ষমতা, ক্ষমতার প্রয়োগ, ক্ষমতার ভারসাম্য ইত্যাদি ধরনাগুলোর সম্পর্কে ভালো মতো জেনে আসতে অনুরোধ করবো।

লেখক: বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতি গবেষক ও যুবনেতা৷

Sharing is caring!