আর্থিক সংকটের দারপ্রান্তে ক্বওমী মাদ্রাসা

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ৭, ২০২০
আর্থিক সংকটের দারপ্রান্তে ক্বওমী মাদ্রাসা

মুফতি মুহাম্মদ উল্লাহ রিজওয়ান

 

ধর্মীয়শিক্ষা জাতির মিরুদন্ড,আর তা ক্বওমী মাদ্রাসায় দেয়া হয়, এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্বওমী মাদ্রসাসমূহ যে নিয়ম পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়ে আসছে, প্রকৃতপক্ষে তার শিকড়ের সম্পর্ক নবী করীম(সাঃ) এর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত মাদ্রাসা সুফফার সাথে।

কিন্তু ভারত উপমহাদেশে – মাদ্রসার স্বতন্ত্র ভবন, আবাসিক বোর্ডিং, ধারাবাহিক শ্রেনীবিন্যাস, শিক্ষকদের বেতন ভাতা, সর্বসাধারণের দান অনুদান গ্রহণ, মাসিক বাৎসরিক ও মৌসমী কালেকশন, আয় ব্যায়ের বিভিন্ন ফান্ড তৈরী করণ এবং মাদ্রসা পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সার্বিক বিষয়ে ভারতে অবস্থিত মাদরে ইলমী দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপালের অন্যতম, মাওলানা কাসেম নানুতবী (রঃ) কর্তৃক পবর্তিত উসূলে হাশতেগানা তথা অষ্ট মুলনীতির আলোকেই পরিচালিত হয়ে থাকে।

* অষ্ট মূলনীতির সার সংক্ষেপঃ
১। জনসাধারনের সাহায্যে মাদ্রাসা পরিচালনা করা।
২। ছাত্রদের জন্য মাদ্রসার পক্ষ থেকে খাদ্য সরবারহ করা।
৩। নিষ্ঠাবান সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত মজলিসে শুরার তত্ববধানে মাদ্রসা পরিচালনা করা।
৪। সকল শিক্ষক নিষ্ঠাবান এবং সমমনা হওয়া।
৫। যথা সময়ে পাঠ্যসূচি সমাপ্ত করা।
৬। মাদ্রাসার আয়ের জন্য নির্ধারিত কোন উৎস বা পথ না রাখা।
৭। সরকারী কোন সাহায্য গ্রহণ না করা বরং তা ক্ষতিকর মনে করা।
৮। মোখলেছ ব্যক্তিদের চাঁদার প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করা।

উক্ত অষ্ট মূলনীতির প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম পয়েন্ট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ক্বওমী মাদ্রাসার আর্থিক আয়ের মুল উৎস হল দান অনুদান ও মৌসমী কালেকশন। তাই ক্বওমী উলামায়ে কেরাম সাধারণ ও মাসিক দান অনুদান গ্রহণ করার পাশাপাশি মৌসমী কালেকশনকেও গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

* আমার মতে মৌসমী কালেকশন মৌলিক ভাবে তিন ভাগে বিভক্তঃ
১। রমজানের কালেকশনঃ তথা আগামী এক বৎসরের জন্য মাদ্রাসার আর্থিক সঞ্চয় জোগাড় করার লক্ষে ক্বওমী উলামায়ে কেরাম রমজানের পুর্ব থেকেই রশিদ বই, পোস্টার, কেলেন্ডার ও বাৎসরিক আয় ব্যায় সম্ভলিত আবেদন পত্র ছাপানোসহ ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকেন। এবং তারা দেশ-বিদিশের বিভিন্ন অঞ্চলে কালেকশন করার জন্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাহে রমজানে ব্যস্ততম সময় পার করেন। ফলে যাকাত ফিতরা দান সদকা কাফফারা মান্নত ইত্যাদি গ্রহণ করতঃ মাদ্রাসার সাধারণ ও গোরাবা ফান্ড তৈরী করে থাকেন।

২।কুরবানী কালেকশনঃ তথা ক্বওমী মাদ্রসার ছাত্র শিক্ষক কুরবানী ঈদের দিন নিজ পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদের আনন্দ ত্যাগ করে সংশ্লিষ্ট মাদ্রসার আর্থিক সঞ্চালনে বিনা পরিশ্রমে মানুষের কুরবানির পশু জবেহ করে থাকেন। এবং কুরবানী পশুর চামড়া ফ্রি অথবা সল্প দরে ক্রয় করে সরকারি/বেসরকারি দরে বিক্রি করেন। এতে মাদ্রসার গোরাবাফান্ড তৈরী হয়ে থাকে।

৩। মাহফিল কালেকশনঃ তথা প্রতিটি মাদ্রাসা বাৎসরিক কমপক্ষে একটা মাহফিলের আয়োজন করে থাকেন। এতে দেশবরেন্য উলামায়ে কেরামদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীকে ধর্মীয় খোরাক দিয়ে থাকেন। এবং মাহফিলের পুর্বে মাহফিল বাস্তবায়ন করার লক্ষে ও মাহফিলের সময় মাদ্রসার আর্থিক সঞ্চালনে শ্রোতাদের থেকে কিছু কালেকশন করে থাকেন।এতে মাদ্রাসার সাধারণ ও গোরাবাফান্ড তৈরীতে অনেক সহয়ক হয়ে থাকে।

উক্ত আয়কৃত অর্থ দ্বারা ক্বওমী উলামায়ে কেরাম শরয়ী বিধান অনুযায়ী ক্ষেত্র বিবেচনায় এতিম মিসকিন, গরীব অসহায় ছাত্রদের পড়া লেখা, খাওয়া দাওয়া, ও চিকিৎসার জন্য ফ্রি ব্যবস্থা করে থাকেন এবং শিক্ষকদের বেতন ভাতা দিয়ে থাকেন। এইভাবেই মূলত ক্বওমী মাদ্রসা পরিচালিত হয়ে থাকে।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হলেও সত্য যে, একদিকে গত দু তিন বৎসর যাবত আমাদের দেশে কুরবানীর চামড়া মুল্যহীন হয়ে যাওয়ায় অনেক ক্বওমী মাদ্রসা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। রমজান টু রমজানের সৎসরিক চাকা ঘুরাতে তাদের অনেক হিমশিম খেতে হয়েছে। এটা ক্বওমী মাদ্রাসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য ইসলাম বিদ্বেষী ইহুদি নাসারাদের হীনষড়যন্ত হতে পারে বলে দেশের বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম ধারণা করেছেন।

অপর দিকে বর্তমান করোনা ভাইরাসের তান্ডবে সারা বিশ্ব আর্থিক সংকটের একেবারে দারপ্রান্তে হামাগুড়ি দিচ্ছে, মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে, বিশ্ব অর্থনৈতিকের চাকা তালাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে, সারা বিশ্বের যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।পুরাদেশ লকডাউনে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে।

ফলে সকল প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান, অনেক মাদ্রাসার মাহফিল সমাবেশ বন্ধ হয়ে গিয়েছে । তাই মাহফিল কেন্দ্রিক আয়ের উৎস থেকে বঞ্চিত হয়েছে বহু ক্বওমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আবার কালেকশনের গুরুত্বপূর্ণ সময় মাহে রমজান রহমত মাগফিরাত নাজাতের আহবান নিয়ে উকি দিয়ে আসছে অথচ এখনো প্রেস প্রকাশনালয়, কলকারখানা বন্ধ। কালেকশন করার জন্য রশিদ বই, পোস্টার কেলেন্ডার ছাপানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিদেশ কালেকশনের মুহাসসিল (কালেকশনকারী)দের ভ্রমণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাই ক্বওমী ওলামায়ে কেরাম আশংকিত হয়ে পড়েছেন যে,আগামী রমজানে কি হবে.? ক্বওমী মাদ্রসার আগামী শিক্ষাবর্ষের অর্থনৈতিক অপুরনীয় ক্ষতি কি ভাবে সামলানো যাবে.?

আমি ব্যক্তিগত ভাবে এই প্রশ্নগুলো রেখেছিলাম অনেক ক্বওমী ওমালায়ে কেরামের কাছে। তারা বলেছেন. এক তো কওমী মাদ্রাসার মূলভিত্তি তাওয়াক্কুল আলাল্লাহের উপর তাই আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা রেখে বেশি বেশি দুআ দরুদ আর কন্নাকাটি করতে হবে। দ্বিতীয়ত আমাদের বড় বড় আকাবির ও মুরুব্বিগন রয়েছেন, উক্ত বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনার আশা করি, দেখাযাক তারা কি দিক নির্দেশনা প্রদান করেন এবং এখনোতো রমজানের পুর্বে কিছু সময় বাকি আছে, কি হয়.? অপেক্ষায় থাকি। আল্লাহ তায়ালার কারিশ্মা বুঝা বড় দায়।

আল্লাহ তায়ালা সকল ক্বওমী মাদ্রসাকে হেফাজত করুন, আমীন।

লেখক: মুফতি মোহাম্মদ উল্লাহ রিজওয়ান
খতীব, উত্তর আদাবর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মুহাম্মদপুর – ঢাকা।

 

Sharing is caring!