আদর্শ স্বামী: দ্বিতীয় পর্ব

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মার্চ ২১, ২০২০
আদর্শ স্বামী: দ্বিতীয় পর্ব
  • উম্মে হাবিবা সাইমা ( চট্টগ্রাম)

প্রথম পর্বের পর….

এইভাবে চলতে থাকে মারিয়া আর মাহিনের কথা।মাহিন মারিয়াকে পর্দার গুরুত্ব সম্পর্কে নানাভাবে বোঝায়।

কিন্তু মারিয়া মাহিনের কথায় কর্ণপাত ও করে না। তার একটাই ভয়, এই আধুনিক যুগে মর্ডানভাবে না চলে পর্দা করে চললে হুজুরগীরী করে চলতেছি বলবে। আমার তো এরকম বেশভোষা পছন্দ না। শুনবো না মাহিনের কথা সে আমাকে ঘর কোণো করে ফেলার ধান্দা করতেছে। হবো না আমি ঘরকুনো। আমি মর্ডান যুগের মেয়ে আর আধুনিকা মেয়ের মতো চলা ফেরা করবো। (মারিয়া অনমনে চিন্তায় এসব ভাবছে)।

তখনি মাহিন বলে, কি ভাবছো এতো? পর্দা করে এসো। এতোক্ষণ তো বললে আমি লেকচার দিয়ে দেরি করতেছি। এখন নিজে ভাবনায় ডুবে গেছো। যাও তাড়াতাড়ি। মারিয়া বলল, তোমাকে বারবার বলি তুমি একটা আনকালচারড। বাবা-মা তোমার সাথে বিয়ে দিয়ে আমার জীবনটা তেজপাতা করে দিলো। কই আমার মা তো তুমি যেরকম করে পর্দা করতে বলছো সেরকম তো করে না। আর আমাকে ও তো কোনো দিনই বলে নি পর্দা করে চলতে? মর্ডান যুগের মেয়েকে মর্ডান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে দিয়েছে। আমি মর্ডান যুগের মেয়ে, মর্ডান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলবো তাতে কারো কিছু যাই আসে না। আমি আমার মতো করেই চলবো তাতে তোমার কি ? আর হে এইসব হাবিজাবি লেকচার আমার সামনে আর দিবে না।

মাহিন বলল,হাইরে মর্ডান যুগের মেয়ে। তুমি কি জানো মর্ডান যুগটা এসেছে পৃথিবীকে দিন দিন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য। ভালো কিছু করার জন্য না। এই মর্ডান যুগে যারা ইসলামিক শরীয়া অনুযায়ী পর্দা করে চলে তারাই তো প্রকৃত মুমিন মুসলিম। আর যারা বেপর্দা করে চলে তাদের জন্য পৃথিবী দিন দিন নানাভাবে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মানুষের হায়া-শরম দিন দিন চলে যাচ্ছে। মা -বোন কে পর্যন্ত মুল্যায়ন করতে চায় না।

সমাজ যে দুনিয়ার আধুনিকতার কুসংস্কারে ডুবে আছে তা কি কেউ আজও দেখছে। বড়রা তো ঠিক নেই, সেখানে ছোটদের কথা কি বলবো। নারীরা বেপর্দায় চলবে,পর-পুরুষকে দেহের সৌন্দর্য দেখিয়ে তাদের প্রতি আকর্ষিত করবে। এতে মেয়েটা আনন্দিত বোধ করবে এইভেবে যে,তার সৌন্দর্য পর-পুরুষরা দেখতেছে আর তার প্রতি আকর্ষিত হচ্ছে। এতে মেয়েটির মনে হিংসা আর অহংকার চলে আসে। নারীদের পর্দার ব্যাপারে কেউ তাগিদ দিচ্ছে না। উল্টা যুগের সাথে তাল মিলয়ে চলার জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম এনে দিচ্ছে। পর্দা করার জন্য সামান্য বোরকা, হিজাব,হাত,পা মোজা এনে দিচ্ছে না।দুনিয়ার গুমরাহিতায় সকলে ডুবে আছে। এতে যে আখিরাত নষ্ট হচ্ছে এটা দেখছে না। প্রত্যেক স্বামীদের উচিৎ তার স্ত্রী আর কন্যাদের পর্দার ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া। কিন্তু তারা তা দিচ্ছে না। কি করে দেবে তারা তো আছে মর্ডান যুগের রং তামাশায়। আখিরাতে কি জবাব দেবে তার কোনো খেয়ালই যে তাদের নেই। থাক এসব কথা। যার কাজ যেমন সে তেমন ফল পাবে। স্ত্রীদের চলা ফেরার জন্য স্বামীদের জাহান্নামে যেতে হবে আর কি।

মারিয়া কৌতুহলী হয়ে মাহিনের কাছে জানতে চাই, স্ত্রীদের চলাফেরার জন্য স্বামীরা জাহান্নামে যাবে কেনো? স্ত্রীরা চলবে বেপর্দায় এতে স্বামীদের ক্ষতি কি?

মাহিন বলে ,স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের পর্দার করে চলার জন্য তাগিদ দেই নি। পর্দা যে প্রত্যেক মেয়েদের জন্য ফরজ করা হয়েছে তা জানাই নি। বেপর্দায় ভালোভাবে চলার সুযোগ করে দিয়েছে। পর্দা করার জন্য সরঞ্জাম যেমন-বোরকা, হিজাব,হাত মোজা,পা মোজা দেই নি। বিভিন্ন রং তামাশার কাপড় পড়তে দিয়েছে।

ইসলামের মর্মটা বুঝতেছে না। দুনিয়ার গুমরাহী কাজে তাদের হায়াত ব্যয় করে দিচ্ছে। কোন সময় কার মৃত্যু হবে তা কেউ জানে না। সকলে শয়তানের ইশারায় জীবন -যাপণ করতেছে। শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য সবসময় পায়তারাই থাকে। আর মানুষের মাঝে ইসলামের জ্ঞান না থাকার কারণে মানুষ শয়তানের ধোকায় পড়ে গোনাহের কাজে লিপ্ত হচ্ছে।

মাহিন বিভিন্ন ভাবে মারিয়াকে ইসলামে বিধানগুলো বোঝাতে চায়, কিন্তু মারিয়া তার কথার কর্ণপাত ও করছে না।

তবুও মাহিন হাল ছাড়ে না। সে জানে কাউকে জোর করে কোন কিছু বোঝানো যায় না। ধীরে ধীরে বুঝিয়ে শুনিয়ে আনতে হবে। ইসলামের মর্মটা কি বোঝাতে হবে? ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম অনুপ্রেরণার ধর্ম। যে দ্বীনের পথে আসে সে ইসলামের মর্মটা কি বোঝার পর আসে। ইসলাম সম্পর্কে যত জানা যায় তত ভালো লাগে। আরো জানতে ইচ্ছে করে। ইসলামের একেক টি বিষয় সত্যিই মনোমুগ্ধকর কর। মেয়েদের পর্দা কর‍তে বলেছে যাতে মেয়েদের সৌন্দর্য অন্য কেউ না দেখে, যেন তাকে মেয়েদের রুপ যৌবন দেখে দেহের মাপ না নেই। যাতে নিজে গোনাহগার না হই আর অন্যজনকে গোনাহগার না বানাই। কিন্তু বর্তমান মেয়েরা এসব বুঝে না। যেমন মারিয়া তার এক উদাহরণ। আমাকে এভাবে হাল ছেড়ে দিলে হবে না। কেনো আগে ইসলামের মর্ম বুঝি নাই। হায়াত থাক তে আল্লাহ তায়ালা আমাকে হেদায়াত দান করেছেন তার জন্য আল্লাহর দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া আদায় করে শেষ করতে পারবো না। ইসলাম সম্পর্কে যত জানছি তত বেশি আর ও জানতে ইচ্ছে হচ্ছে।(মাহিন এসব আনমনে চিন্তায় করছে)
মারিয়ার কথায় তার ধ্যান ভাঙ্গে। মারিয়া বলে,যে ধ্যানে পড়ে গেছো সেই ধ্যান থেকে আসার কোনো নাম নাই। কি বেড়োবে না। নাকি যেতে ইচ্ছে করছে না।

মারিয়াকে এভাবে বোঝালে হইতো হবে না। সময়ে সময়ে কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে বোঝাতে হবে। তবেই বুঝবে ইসলামের দেওয়া বিধি-বিধান গুলোর মূল্যটা কি?

-আচ্ছা মারিয়া তোমার থেকে একটা কথা জানতে চাই। বলবে কি?
মারিয়া বলে, অবশ্যই বলবো। বলো কি জানতে চাও?

তুমি কি সত্যিই এভাবে বেড়োবে। কত খারাপ লাগছে দেখতে তা তুমি জানো না। তোমার মনে হচ্ছে তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে তাই না।

মারিয়া বলল, তা তো অবশ্যই কত সময় ব্যয় করে অনেক কষ্ট করে সেজেছি তোমার সাথে বেড়োব বলে।

মাহিন বলে,তুমি এতো কষ্ট করে সুন্দর করে সেজেছো আমার সাথে বেড়োবে বলে। মারিয়া বলে,তা নইতো কি?
মাহিন বলে, আচ্ছা ঠিক আছে বুঝলাম আমার সাথে বেড়োবে তাই এতো সুন্দর করে সেজেছো শুনে খুশি হলাম। কিন্তু এভাবে? অন্তত মারিয়া তুমি মাথায় হিজাবটা পড়লেও পারতে। কিন্তু তুমি সুন্দর করে সেজে, চুল খোলা রেখে, শাড়ি পড়ে,কপালে টিপ দিয়ে রাস্তায় হেটে হেটে যাবে আমার না কেমন জানি ঘটকা লাগছে। আমার সাথে বেড়োতে হলে কি এভাবে টাইটপিট অর্ধহাতি ব্লাউজ পড়ে, পেট, পিঠ দেখিয়ে বেড়োতে হবে। এছাড়া কি অন্য কোনো উপায় নেই?

মারিয়া বলে,উপায় তো আছে কিন্তু…….
মাহিন বলে, কিন্তু কি? মারিয়া বলে,এটা হচ্ছে মর্ডান আধুনিক যুগ। এই যুগে চালচলন যেরকম সেরকম তো হতে হবে। যদি তা না হই মানুষ তোমাকে কতকিছু বলবে?

মানুষ বলবে মাহিন এটা তুই শেষ পর্যন্ত কি বিয়ে করলি। এটার সাথে এই কয়েকবছর সংসার করলি কেমন করে। এই এক টা গেয়ো ভুতকে নিয়ে তুই কিভাবে আছিস। আর দেখ অন্যরা তাদের বউকে নিয়ে কিরকম ফুর্তি আমেজ করে দিন কাটাচ্ছে। ইত্যাদি আরো অনেক কিছু……!
এগুলো শুনে তো আমার মরে যাওয়ার অবস্থায় হবে। এইসব শোনার চাইতে মরে যাওয়াই বোধহই ভালো। আমার স্বামীকে সবাই এরকম কটু কথা বলবে। আমি তার স্ত্রী হয়ে কিভাবে এই কথাগুলো সহ্য করি বলতো?

মারিয়ার এইসব কথা শুনে মাহিনের প্রচন্ড রাগ উঠে যায়। মারিয়াকে চড় দিতে যাবে এমন সময় নিজেকে সংযত রেখে হাত নামিয়ে পেলে আর অন্যদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। সে জানে এভাবে চড় মেরে বকাঝকা করে কোনো লাভ হবে না বরং আরো বিফলে যাবে। মাহিন মারিয়াকে চড় দিতে যাবে এমন সময় একটি হাদিসের কথা মনে পড়েন

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছে”আর ধৈর্যের ফল অত্যন্ত মধুর । তাই সে নিজেকে সংযত করে পেলে।

মাহিনের প্রচুর খারাপ লাগতেছে মারিয়ার এই মর্ডান যুগের স্টাইলিশ কথা শুনে। ইসলামের মর্ম বুঝছে না বিধায় মেয়েটা আধুনিক যুগের কালচারড নিয়ে এখনো পড়ে আছে।  আমি ও দ্বীনের পথে হেদায়াত পাওয়ার আগে এরকম ছিলাম। বেশিদিন হচ্ছে না হেদায়াত পেয়েছি। আল্লাহর কাছে লক্ষ কোটি শোকর আদায় করলেও শোকর আদায় করা শেষ হবে না। কারণ তিনি আমাকে মৃত্যুর হওয়ার আগেই হেদায়াত দিয়েছেন। আধুনিক কালরচারের মধ্যে যখন ছিলাম তখন যদি আমার মৃত্যু হতো তাইলে আমি অমৃত বেহেশত পেতাম না। জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হতো। যেখানে কষ্ট বৈকি অন্যকিছু নেই।

চলবে….

পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন আগামীকাল ঠিক  এই সময় পর্যন্ত

প্রথম পর্ব: আদর্শ স্বামী

 

[লেখায় কারও অনুভূতিতে আঘাত লাগলে আওয়ার বাংলাদেশকে দোষারোপ না করার বিশেষ অনুরোধ থাকবে]

Sharing is caring!